ঢাকা ০৬:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যে কৌশলে খেলা বদলে দিলেন থালাপতি বিজয়

এই দেশ এই সময় ডেস্ক:
  • আপডেট সময় : ০৩:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬ ২ বার পঠিত

তামিলনাড়ুর রাজনীতির আঙিনায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যের মসনদে বসতে চলেছেন রূপালি পর্দার কোনো মহাতারকা, যা শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি এম জি রামচন্দ্রনের হাত ধরে। জয়ের এই সুনিশ্চিত পদধ্বনি কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয় বরং এটি তামিল রাজনীতির প্রচলিত ব্যাকরণকে আমূল বদলে দেওয়ার এক প্রবল সংকেত দিচ্ছে। জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যাকে ভক্তরা ভালোবেসে ‘থালাপতি’ বলে ডাকেন, আজ সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলগা ভেট্টি কাঝাগাম’ (টিভিকে) অভাবনীয় সাফল্যের মুখ দেখছে। রাজ্যের ২৩৪টি আসনের মধ্যে বিজয়ের দল ১০০ থেকে ১১৮টি আসনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। যা ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করার জন্য প্রায় যথেষ্ট। মাত্র দুই বছর আগে রাজনৈতিক দল ঘোষণা করে এভাবে মূলধারার দলগুলোকে টক্কর দেওয়া তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তামিলনাড়ুর মানুষ এখন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র দ্বিমুখী রাজনীতির বাইরে তৃতীয় একটি বিকল্পকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

বিজয় যেভাবে নিজেকে রাজনীতির ময়দানে প্রস্তুত করেছেন, তা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং ধীরস্থির এক যাত্রার ফসল। প্রথাগত অভিনেতাদের মতো তিনি কেবল পর্দার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে হুট করে রাজনীতিতে নামেননি। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মক্কাল আইয়াক্কাম’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠনে রূপান্তর করেছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংগঠনটি বুথ স্তরে মানুষের পাশে থেকে ত্রাণ কাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা আজ তাঁর নির্বাচনী সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের সমর্থিত প্রার্থীদের জয় ছিল তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় লিটমাস টেস্ট। সেই জয়ই প্রমাণ করে দিয়েছিল, বিজয়ের জনপ্রিয়তা কেবল সিনেমার হলের শিস আর তালি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যালট বাক্সেও রূপান্তর করার ক্ষমতা রাখে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নাম ঘোষণা করেন, তখন তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আর সিনেমা করবেন না। নিজের ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় অভিনয় ত্যাগ করার এই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোটারদের মনে তাঁর প্রতি অগাধ বিশ্বাস তৈরি করেছে।

বিজয় তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে প্রথাগত উগ্র বক্তা হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া টাউন হল এবং ছোট ছোট জনসভার মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। বিশেষ করে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটারদের কাছে তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং আধুনিক চিন্তা-ভাবনা এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক গাফিলতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার যে দাবি তিনি তুলেছেন, তা রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি কাটাতে সহায়ক হয়েছে।

যদিও বিজয়ের এই যাত্রা একদম নিষ্কণ্টক ছিল না। ২০২৫ সালে কারুরে একটি দলীয় কর্মসূচিতে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে সেই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর পরিপক্কতা এবং ভুল সংশোধনের মানসিকতা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। তিনি যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন, তা প্রমাণ করেছে যে তিনি কেবল একজন অভিনেতাই নন বরং একজন দায়িত্বশীল জননেতা হওয়ার যোগ্য। এই কঠিন সময়গুলোই তাঁকে রাজপথের রাজনীতির কঠিন পাঠ শিখিয়েছে।

এম জি রামচন্দ্রন বা জয়ললিতার সাথে বিজয়ের তুলনা করা হলেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অনেকটাই আলাদা এবং সময়োপযোগী। এমজিআর যেখানে জনমোহিনী প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করেছিলেন, বিজয় সেখানে গুরুত্ব দিচ্ছেন কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ শাসনের ওপর। তামিলনাড়ুর মানুষ দীর্ঘদিনের একঘেয়েমি এবং দুর্নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার যে আকুলতা দেখাচ্ছিল, বিজয় ঠিক সেই স্নায়ুকেই ছুঁতে পেরেছেন। ফলে টিভিকে আজ কেবল একটি দল নয় বরং এক বিশাল সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

যে কৌশলে খেলা বদলে দিলেন থালাপতি বিজয়

আপডেট সময় : ০৩:৩৬:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

তামিলনাড়ুর রাজনীতির আঙিনায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। দীর্ঘ ৪৯ বছর পর দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যের মসনদে বসতে চলেছেন রূপালি পর্দার কোনো মহাতারকা, যা শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি এম জি রামচন্দ্রনের হাত ধরে। জয়ের এই সুনিশ্চিত পদধ্বনি কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয় বরং এটি তামিল রাজনীতির প্রচলিত ব্যাকরণকে আমূল বদলে দেওয়ার এক প্রবল সংকেত দিচ্ছে। জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যাকে ভক্তরা ভালোবেসে ‘থালাপতি’ বলে ডাকেন, আজ সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী বিজয়ের নবগঠিত দল ‘তামিলগা ভেট্টি কাঝাগাম’ (টিভিকে) অভাবনীয় সাফল্যের মুখ দেখছে। রাজ্যের ২৩৪টি আসনের মধ্যে বিজয়ের দল ১০০ থেকে ১১৮টি আসনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। যা ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করার জন্য প্রায় যথেষ্ট। মাত্র দুই বছর আগে রাজনৈতিক দল ঘোষণা করে এভাবে মূলধারার দলগুলোকে টক্কর দেওয়া তামিল রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, তামিলনাড়ুর মানুষ এখন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র দ্বিমুখী রাজনীতির বাইরে তৃতীয় একটি বিকল্পকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

বিজয় যেভাবে নিজেকে রাজনীতির ময়দানে প্রস্তুত করেছেন, তা অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং ধীরস্থির এক যাত্রার ফসল। প্রথাগত অভিনেতাদের মতো তিনি কেবল পর্দার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে হুট করে রাজনীতিতে নামেননি। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মক্কাল আইয়াক্কাম’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠনে রূপান্তর করেছিলেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংগঠনটি বুথ স্তরে মানুষের পাশে থেকে ত্রাণ কাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে, যা আজ তাঁর নির্বাচনী সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের সমর্থিত প্রার্থীদের জয় ছিল তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় লিটমাস টেস্ট। সেই জয়ই প্রমাণ করে দিয়েছিল, বিজয়ের জনপ্রিয়তা কেবল সিনেমার হলের শিস আর তালি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যালট বাক্সেও রূপান্তর করার ক্ষমতা রাখে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নাম ঘোষণা করেন, তখন তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আর সিনেমা করবেন না। নিজের ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় অভিনয় ত্যাগ করার এই বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সাধারণ ভোটারদের মনে তাঁর প্রতি অগাধ বিশ্বাস তৈরি করেছে।

বিজয় তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেকে প্রথাগত উগ্র বক্তা হিসেবে উপস্থাপন না করে বরং একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সোশ্যাল মিডিয়া টাউন হল এবং ছোট ছোট জনসভার মাধ্যমে তিনি শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। বিশেষ করে প্রথমবার ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটারদের কাছে তাঁর স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং আধুনিক চিন্তা-ভাবনা এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক গাফিলতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার যে দাবি তিনি তুলেছেন, তা রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি কাটাতে সহায়ক হয়েছে।

যদিও বিজয়ের এই যাত্রা একদম নিষ্কণ্টক ছিল না। ২০২৫ সালে কারুরে একটি দলীয় কর্মসূচিতে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় তাঁকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে সেই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর পরিপক্কতা এবং ভুল সংশোধনের মানসিকতা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কেড়েছে। তিনি যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়েছেন, তা প্রমাণ করেছে যে তিনি কেবল একজন অভিনেতাই নন বরং একজন দায়িত্বশীল জননেতা হওয়ার যোগ্য। এই কঠিন সময়গুলোই তাঁকে রাজপথের রাজনীতির কঠিন পাঠ শিখিয়েছে।

এম জি রামচন্দ্রন বা জয়ললিতার সাথে বিজয়ের তুলনা করা হলেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অনেকটাই আলাদা এবং সময়োপযোগী। এমজিআর যেখানে জনমোহিনী প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করেছিলেন, বিজয় সেখানে গুরুত্ব দিচ্ছেন কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ শাসনের ওপর। তামিলনাড়ুর মানুষ দীর্ঘদিনের একঘেয়েমি এবং দুর্নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার যে আকুলতা দেখাচ্ছিল, বিজয় ঠিক সেই স্নায়ুকেই ছুঁতে পেরেছেন। ফলে টিভিকে আজ কেবল একটি দল নয় বরং এক বিশাল সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি