তৃণমূলের দুর্গে ভূমিধস জয় বিজেপির
- আপডেট সময় : ০১:১৬:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৫ মে ২০২৬ ১ বার পঠিত

উত্তেজনা, সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের লড়াইয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। গতকাল সকালে ফল ঘোষণা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে রাজ্যের ক্ষমতায় বসা তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন অবসান হতে যাচ্ছে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দলটির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান ঘটতে যাচ্ছে। জয় শ্রীরাম স্লোগানে উত্তর ভারতে একের পর এক রাজ্যের ক্ষমতায় আসা বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গেও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হতে যাচ্ছে।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮ আসনে জয়, আর সর্বশেষ প্রাপ্ত প্রবণতা অনুযায়ী, বিজেপি ১৮০ থেকে ২০২ আসনের মধ্যে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)
১০০–এর নিচে থেকে ৯৪ বা ৮৫ আসনে এগিয়ে।
গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে নির্বাচনী অনিয়ম ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গের অভিযোগে পুরো কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণ হবে ২১ মে এবং গণনা হবে ২৪ মে। ফলে সোমবার ফলতা বাদে বাকি কেন্দ্রগুলোর ভোটগণনা চলছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি নজর রয়েছে ভবানীপুর কেন্দ্রের দিকে। এ আসনে মুখোমুখি হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। প্রথম দিকে শুভেন্দু এগিয়ে থাকলেও কয়েক দফা গণনার পর মমতা এগিয়ে যান। তবে প্রতি রাউন্ডে ব্যবধান কমিয়ে আনছেন শুভেন্দু।
শেষ পর্যন্ত ভবানীপুরে নিজের ঘরেই হেরে গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিলেন মমতা। পরাস্ত হয়েছিলেন। এ বার মমতারই আসনে মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা। তাতেও পরাস্ত হলেন তৃণমূলনেত্রী। অন্য কোনো আসনে প্রার্থী না হওয়ায় এবার মমতার বিধানসভায় যাওয়ার রাস্তা আপাতত বন্ধ হয়ে গেল।
ভোটগণনার মধ্যেই কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, যেখানে ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটগণনা চলছে, সেখানে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূলের অস্থায়ী ক্যাম্পে বিজেপি কর্মী–সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে। তৃণমূল কর্মীদের বসার জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয় মমতার ফেস্টুন ও ব্যানার।
পরে তৃণমূল কর্মীরা জগদীশচন্দ্র বসু কলেজে আশ্রয় নিলে, সেখানেও লাঠি হাতে বিজেপি সমর্থকদের উপস্থিতি দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। নবান্নের বাইরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে, সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
রাজ্যের কোচবিহারের দিনহাটায় বিজেপি ও তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠিচার্জ করে। সেখানে বিজেপি প্রার্থী অজয় রায় প্রায় ১০ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন তৃণমূলের উদয়ন গুহর বিরুদ্ধে।
গণনাকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচন কমিশন কড়া পদক্ষেপ নেয়। ভবানীপুরের গণনাকেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ ছাড়া প্রার্থী না হওয়ায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ভোটগণনার প্রবণতা বিজেপির পক্ষে গেলেও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী বিজেপির পক্ষে কাজ করছে এবং গণনার তথ্য ‘ইচ্ছামতো’ প্রকাশ করা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে গতকাল দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় মমতা বলেন, ‘কোনো প্রার্থী বা কাউন্টিং এজেন্ট যেন গণনাকেন্দ্র না ছাড়েন, এটি বিজেপির পরিকল্পনা।’ তিনি আরও দাবি করেন, অনেক জায়গায় গণনা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মেশিনে গরমিল ধরা পড়েছে, বিশেষ করে কল্যাণীতে সাতটি মেশিনে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
তবে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সূর্যাস্তের পর ফল আমাদের পক্ষে যাবে। আমরা বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই চালিয়ে যাব।’
অন্যদিকে বিজেপি নেতারা ইতোমধ্যেই জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, ‘মমতার খেলা শেষ’ রাজ্যে বিজেপিই সরকার গঠন করবে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিজেপি কর্মীদের স্বপ্ন বাস্তব হতে যাচ্ছে।’
বিজেপি সরকার গঠন করলে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী, শমীক ভট্টাচার্য, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার এবং স্বপন দাশগুপ্ত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আগেই বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হবেন একজন বাঙালি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিপুল বিজয়ের সম্ভাবনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক এক্স পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে!’ ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তি এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতির জয় হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক নাগরিকের প্রতি আমার প্রণাম রইল।
বিজেপি তাদের সম্ভাব্য জয়ের পেছনে পাঁচটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছে। নারী ভোটে প্রভাব, সরকারি কর্মীদের ডিএ ও চাকরির প্রতিশ্রুতি, কেন্দ্রীয় উন্নয়নের বার্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ, ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর)।
ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা অমিত শাহ গতকাল এক এক্স বার্তায় বলেছেন, বাংলার মানুষ অনুপ্রবেশকারী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের এমন শিক্ষা দিয়েছে, যা তোষণের রাজনীতি করা দলগুলো কোনোদিন তা ভুলতে পারবে না। বাংলা যে আশা ও আকাক্সক্ষা নিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের ওপর এ বিশ্বাস রেখেছে, বিজেপি অবশ্যই তা পূরণ করবে। দলীয় কর্মীদের অভিনন্দন জানিয়ে অমিত শাহ লিখেছেন, চৈতন্য মহাপ্রভু, স্বামী বিবেকানন্দ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতো মহাপুরুষদের পবিত্র ভূমি বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এবং ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে বিজেপি দিন–রাত এক করে দেবে।
ভোটের প্রবণতা প্রকাশ্যে আসতেই কলকাতায় মমতার বাড়ির বাইরে বিজেপি কর্মীরা ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেন। বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে দেখা যায়।
ভোটগণনার চূড়ান্ত ফল এখনও ঘোষণা না হলেও প্রবণতা স্পষ্টভাবে বিজেপির পক্ষে। তবে এ নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনাই নয়, বরং সহিংসতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্কও সমানভাবে সামনে এসেছে।














