সংসার চালাতে ইউছুফের স্ত্রী পাশের একটি নারী শিক্ষার্থীদের মেসে ঝিয়ের কাজ নিয়েছেন। দুবেলা রান্না করে তিনি মাসে পান হাজার দেড়েক টাকা। তাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে ইমরানও সকালে ও স্কুল শেষে স্থানীয় দোকানিদের হালকা কাজ করে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ টাকা আয় করে। সব মিলিয়ে ইউছুফের পরিবারের মাসিক আয় এখন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আয় আগের তুলনায় বাড়লেও জীবনযাত্রার মান কমেছে বলে মনে করেন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ইউছুফ।
কারণ তার সংসারে অভাব-অনটন ও অশান্তি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ২০১৩ সালে যে বাসায় ৯০০ টাকা ভাড়ায় উঠেছিলেন, সেই বাসার বর্তমান ভাড়া ৬ হাজার টাকা। দেড় থেকে দুইশ টাকা দিয়ে চাল ও বাজারসামগ্রী কিনে যেখানে পুরো পরিবারের তিন বেলা খাবার জুটত, এখন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার বাজার করেও ঠিকমতো খাওয়া হয়ে ওঠে না।
জেলার শ্রমজীবী মানুষের জীবনেরই যেন প্রতিচ্ছবি মুহাম্মদ ইউছুফ। তার মতোই স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবন এখন কাহিল হয়ে পড়েছে।
শুধু ইউছুফ নন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাপনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্দিষ্ট ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। শহরে বাড়ছে বাসাভাড়াও। অথচ এসব ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এর সঙ্গে বেড়েছে গাড়িভাড়া, রিকশাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়। ফলে সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। বাড়তি খরচের ধাক্কা আসছে বাড়িওয়ালা, সবজি বিক্রেতা, দোকানি ও রিকশাচালকদের কাছ থেকেও। সব দিক থেকেই বেসামাল হয়ে পড়েছে জনজীবন।
তেল-গ্যাসে ভর্তুকি কমানোর অজুহাতে দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মানুষের জীবনে বিরাজমান অভাব আরও তীব্র হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। এতে অভাব-অনটনের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে।
সীমিত আয়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবজি, মাছ, মাংস, চাল ও তেলসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো সংসারের চাকা চলছে না। শুধু সীমিত আয়ের মানুষই নয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বড় ধাক্কা লেগেছে দিনমজুর থেকে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তের জীবনেও।
বাজারে ভালো মানের চালের কেজি ৬০ থেকে ৯০ টাকা। মোটা চালও ৫০ টাকার কমে মিলছে না। ওএমএসের চালও অপ্রতুল। কিছুদিন আগেও জিম ও আলুভর্তা দিয়ে দুবেলা ভাত খেতে পারলেও এখন জিমের দামও স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সবজিও মধ্য ও উচ্চবিত্তের খাবারে পরিণত হচ্ছে বলে মনে করছেন ক্রেতারা।
সবজির দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিম্ন আয়ের ক্রেতারা সবজির দোকানে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। বাজারে তুলনামূলক কম দামের সবজি ঝিঙা ও মিষ্টিকুমড়ার কেজিও ৫০ টাকা। অন্য সবজির দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকার কমে নেই। এ অবস্থায় অনেকের প্রশ্ন—এভাবে চললে মানুষ কী খেয়ে বাঁচবে?
শহরের কালুর দোকান এলাকায় এক নারী উদ্যোক্তার পরিচালিত মেসে ১৫ থেকে ২০ জন নারী শিক্ষার্থী থাকেন। ৭৫০ বর্গফুটের বাসায় মেসটি চালুর সময় সিটপ্রতি ভাড়া ছিল ৫০০ টাকা। এখন ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার টাকার কমে সিট ভাড়া পাওয়া যায় না। গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়ায় তাদের ব্যয়ও বেড়েছে।
আগে এই মেসে থেকে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের সব মিলিয়ে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় চলত। বর্তমানে সেই খরচ দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫ হাজার টাকায়। কলেজে যাতায়াতের খরচও বেড়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইকবাল হোসেন। অর্ধযুগ আগে তার যে বেতন ছিল, তা দিয়ে ছয়জনের সংসার ভালোভাবেই চলত। এখন বেতন বাড়লেও আগের মতো কুলিয়ে উঠতে পারছেন না তিনি।
বাজারের পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ইকবাল বলেন, ‘বাড়ির বড় ছেলে হলেও আগে বাজারের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক ছিল না। এখন নিজের সংসার সামলাতে হয়। তাই বাজারের পরিস্থিতি নিজেই দেখছি। প্রতিনিয়ত চাল, কাঁচা তরকারি, মাছ, মাংস ও ডিমের দামে তারতম্য থাকে।’
শহরের একটি অভিজাত হোটেলে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন মোহাম্মদ ফারুক। কলাতলী এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন তার বাবা-মা। মাসিক বেতন ও সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা পান। কিছুদিন আগেও এই আয় দিয়ে শহরের থাকা-খাওয়া মিটিয়ে বাড়িতে বাবা-মায়ের চাহিদামতো টাকা পাঠাতে পারতেন। এখন বাসাভাড়া, ভোগ্যপণ্যের দাম ও সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় মিটিয়ে দুই পরিবার সামলানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
ফারুকের মতোই অবস্থা হোটেল-মোটেল জোনের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজে চাকরি করা পেশাজীবীদের।
শহরের গৃহবধূ আমেনা বলেন, তার স্বামী ছয় বছর আগে যে বেতন পেতেন, এখন তা ১৫ শতাংশ বেড়েছে। আগে মাসের খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন। এখন সেটি সম্ভব হয় না। বরং প্রতি মাসেই টানাটানি পড়ে যায়।
আমেনার মতে, জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার পণ্যের দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে চিকিৎসকের ফিও। আগে সন্তানদের চিকিৎসক দেখাতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ফি দিতে হতো, এখন তা বেড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা হয়েছে। শিশুখাদ্যের দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। সংসারের ব্যয় সামঞ্জস্য করতে মাছ-মাংস কেনা কমিয়েছেন তিনি।
এক নিকটাত্মীয়ের ছেলের পড়াশোনার ব্যয়ও তাকেই বহন করতে হয়। আগের তুলনায় সেই ব্যয়ও বেড়েছে। বাড়ির পাশের দুজন বয়স্ক ব্যক্তির চিকিৎসা ও ওষুধ কিনে দিতে হয় তাকে। এসব করতে গিয়ে এখন প্রতি মাসেই ঋণ করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শহরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রুমেনা আকতার। চাকরির বয়স ১৫ বছর পেরিয়েছে। তার সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে। দুজনই পড়াশোনা করছে। একজন একাদশ শ্রেণিতে, অন্যজন ষষ্ঠ শ্রেণিতে। নিজের বেতন ও স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালাতেও তাদের পরিবারে টান পড়ছে। মেয়েদের শিক্ষা ব্যয়, বাসাভাড়া, ভোগ্যপণ্য ও যাতায়াতসহ যাবতীয় খরচ ক্রমেই বাড়ছে।
রুমেনা বলেন, ‘বাসাভাড়া, গাড়িভাড়া হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেওয়া গেলেও চাকরিজীবীদের বেতন ইচ্ছেমতো বাড়ানো যায় না। ফলে এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ দূরে থাক, বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে পড়েছে।’
কক্সবাজার শহরের একটি পত্রিকা অফিসে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করেন আবদুল্লাহ। স্ত্রী, মা ও বোনসহ চারজনের সংসারে নিজের বেতনের টাকা দিয়ে পুরো মাস ভালোভাবে চলা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
দীর্ঘ এক যুগ আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন ঈদগাঁওর শিক্ষক আকরাম আলী। অবসর নেওয়ার পর একটি দোকান ও এক ছেলের আয়ে ১০ সদস্যের সংসার ভালোভাবেই চলত। এখন তাদের দোকানের সংখ্যা আরও একটি বেড়েছে। আরেক ছেলে সদ্য পড়াশোনা শেষ করে পারিবারিক আয়ে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু দুই দোকানের লাভের অংশ ও সন্তানদের চাকরির টাকায় আগের মতো সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
আকরাম আলী বলেন, ‘বাজারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। মানুষের আয়ের পথ তেমন বাড়ছে না। সুতরাং বেচাকেনাও সীমিত হয়ে এসেছে। এর ফলে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মানুষের কাছে বোঝাস্বরূপ। শুধু সীমিত আয়ের মানুষই নয়, সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এখন কষ্টে দিনযাপন করছেন। দ্রব্যমূল্য বাড়লে সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা খুবই করুণ হবে—এটাই স্বাভাবিক। কোনো সরকারের পক্ষেই এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ নয়।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকার মতে, সামষ্টিক অর্থনীতি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। কমে গেছে বৈদেশিক সাহায্য। সরকার ঋণ নিয়ে দেশ চালাচ্ছে। সরকার বেশি দামে জ্বালানি এনে কম দামে বিক্রি করছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করায় সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে। কৃষি ও খাদ্য খাতেও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সীমিত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কাগুজে মুদ্রা ছেপে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়া গেলেও মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।’
জেলার সচেতন মহলের মতে, বাসাভাড়া, গাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। জীবনযাপনের ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মানুষ দৈনন্দিন ব্যয় কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ব্যয় কমানোর মতো আর কোনো খাত খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
তাদের মতে, এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাই সবার আগে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।



