ঢাকা ০৫:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘ডাবল ডায়াবেটিস’ কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? প্রাথমিক লক্ষণ, কারণ ও জটিলতা এড়ানোর উপায় নির্বাচনে জামায়াত কেন নারী প্রার্থী দেয়নি, যে ব্যাখ্যা দিলেন মারদিয়া মমতাজ ডেঙ্গু নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর এ–প্রাসাদ থেকে ও–প্রাসাদ—দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সৌদি যুবরাজকে দুর্গাপূজা ঘিরে নিরাপত্তাঝুঁকি নেই: ডিএমপি ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা চেয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েও কেন হুতিদের ঠেকাতে পারছে না সৌদি? সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ড মেঘনায় জেলেদের ধাওয়া করতে গিয়ে ডুবল নৌ-পুলিশের স্পিডবোট

‘ডাবল ডায়াবেটিস’ কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? প্রাথমিক লক্ষণ, কারণ ও জটিলতা এড়ানোর উপায়

এই দেশ এই সময় ডেস্ক:
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পঠিত

ডায়াবেটিস সাধারণত দুই ধরনের—টাইপ-১ ও টাইপ-২। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারে না। তবে কিছু মানুষের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতাও তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাকে সাধারণভাবে ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ বলা হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে হৃদ্যন্ত্র, চোখ, স্নায়ু ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের মতো কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ চিকিৎসাবিজ্ঞানে সর্বজনস্বীকৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ডযুক্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার বৈশিষ্ট্য দেখা দিলে সাধারণভাবে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

ভারতের ফোর্টিস হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের পরামর্শক চিকিৎসক ডা. ভানু মিশ্রের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র, চোখ, স্নায়ু ও কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই লক্ষণগুলো শনাক্ত করার পাশাপাশি রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

ডাবল ডায়াবেটিস কী?

ডাবল ডায়াবেটিস বলতে সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়াকে বোঝায়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় খুব কম বা একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। কারণ, শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এ কারণে বেঁচে থাকার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির ইনসুলিন গ্রহণ অপরিহার্য।

অন্যদিকে, ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি আগের মতো সাড়া দেয় না। ফলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হয়। রক্তে শর্করা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখতে তখন শরীরের তুলনামূলক বেশি ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কারও মধ্যে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ইনসুলিনের মাত্রা ও চিকিৎসাপদ্ধতি সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য জীবনযাপনের বিষয়েও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

তবে শুধু ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা থাকলেই কারও টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই রোগের ধরন নির্ধারণ করা উচিত।

ডাবল ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সতর্কসংকেত

ডাবল ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার লক্ষণের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই রক্তে শর্করার পরীক্ষায় পরিবর্তন ধরা পড়ে।

সম্ভাব্য সতর্কসংকেতগুলো হলো—

১. রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন বেশি থাকা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা অনুসরণ করার পরও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে থাকতে পারে।

২. অস্বাভাবিক ক্লান্তি: রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শরীরে ক্লান্তি ও শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

৩. অতিরিক্ত তৃষ্ণা: রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেলে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে বারবার তৃষ্ণা অনুভূত হয়।

৪. ঘন ঘন প্রস্রাব: অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের করে দিতে কিডনিকে বেশি কাজ করতে হয়। এতে প্রস্রাবের পরিমাণ ও ঘনত্ব বাড়তে পারে।

৫. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা: গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এর পেছনে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা ছাড়াও একাধিক কারণ থাকতে পারে।

এসব লক্ষণ শুধু ডাবল ডায়াবেটিসের জন্য নির্দিষ্ট নয়। অনিয়ন্ত্রিত টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও এগুলো দেখা দিতে পারে। তাই রক্তে শর্করার মাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজে থেকে ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

এ ছাড়া বমি, পেটে ব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস নেওয়া, বিভ্রান্তি কিংবা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের ইঙ্গিত হতে পারে। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।

কোন কোন কারণে ঝুঁকি বাড়ে?

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির পেছনে কয়েকটি কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতিরিক্ত ওজন: বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে অতিরিক্ত ওজন না থাকলেও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: নিয়মিত শরীরচর্চা পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়। দীর্ঘসময় বসে থাকা ও শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত শর্করা, চিনিযুক্ত পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস মোট ক্যালরি গ্রহণ ও ওজন বাড়াতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট খাবারের চেয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ, ইনসুলিন গ্রহণ এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা ও বিপাকীয় সমস্যার প্রতি ব্যক্তির প্রবণতা বেশি হতে পারে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের গঠন, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য বিপাকীয় বিষয় এ ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে।

শুধু বেশি চিনি খাওয়ার কারণে ডাবল ডায়াবেটিস হয়—এ ধারণা সঠিক নয়। ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির পেছনে একাধিক জৈবিক ও জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয় কাজ করে।

শরীরের কোন কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?

দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পড়তে পারে।

হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালি: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি। রক্তে শর্করা বেশি থাকার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল, ধূমপান ও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা থাকলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চোখ: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে চোখের রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থাকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। পরে রোগটি বাড়লে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করালে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব।

স্নায়ু: ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলা হয়। এতে বিশেষ করে পা ও পায়ের পাতায় ঝিনঝিন করা, জ্বালাপোড়া, ব্যথা কিংবা অবশভাব দেখা দিতে পারে। অনুভূতি কমে গেলে পায়ের কাটা, ফোসকা বা ক্ষত সহজে বোঝা যায় না। ফলে সংক্রমণ ও পায়ের ঘা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নিয়মিত পা পরীক্ষা করা এবং ক্ষত, ফোলা, ত্বকের রং পরিবর্তন কিংবা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডাবল ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষতি কীভাবে বাড়াতে পারে?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিডনির স্বাস্থ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ও রক্ত পরিশোধনের জন্য দায়ী গঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডা. ভানু মিশ্রের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে।

এই রোগ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে কিডনির ক্ষতি শুরু হলেও অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।

রোগ বাড়তে থাকলে কিডনির ছাঁকনি দিয়ে প্রস্রাবে প্রোটিন বেরিয়ে আসতে পারে। এটি কিডনির ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। সময়ের সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। গুরুতর পর্যায়ে কিডনি বিকল হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ পরীক্ষা এবং রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা নির্ণয় করে প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব।

জটিলতার ঝুঁকি কমাতে করণীয়

ডাবল ডায়াবেটিস সব সময় প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং হৃদ্রোগসহ অন্যান্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা পাওয়া যায়।

পরিকল্পিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাস: শাকসবজি, পূর্ণশস্য, উপযুক্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ও খাবারের সময় নির্ধারণ করতে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ইনসুলিন ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও তার সমন্বয় প্রয়োজন।

নিয়মিত শরীরচর্চা: হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার ও পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইনসুলিন গ্রহণের সময় ও মাত্রার সঙ্গে শরীরচর্চার সমন্বয় করতে হবে। ব্যায়ামের সময় বা পরেও রক্তে শর্করা কমে যেতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ জরুরি।

রক্তে শর্করা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা করলে রক্তে শর্করার ওঠানামার ধরন বোঝা যায়। ধারাবাহিক গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ব্যবহারকারীরা পরীক্ষার ফল ও প্রবণতা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: হৃদ্রোগ ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি কমাতে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপনে পরিবর্তন বা ওষুধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

ধূমপান পরিহার: ধূমপান হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে পারে। হৃদ্যন্ত্র ও কিডনি সুরক্ষায় তামাক পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

চোখ, পা ও কিডনি নিয়মিত পরীক্ষা: ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক সময় উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই তৈরি হয়। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, পায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। কত ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ডায়াবেটিসের ধরন, কত দিন ধরে রোগটি রয়েছে এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

সচেতনতাই জটিলতা এড়ানোর প্রথম ধাপ

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে তাকে সাধারণভাবে ডাবল ডায়াবেটিস বলা হয়। এ অবস্থায় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ডযুক্ত আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়।

রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন বেশি থাকা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে শুধু এসব লক্ষণ দেখে ডাবল ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায় না।

সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি চোখ, স্নায়ু ও কিডনির ক্ষতি শনাক্ত করতে নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বা অন্য কোনো সমস্যা এর পেছনে কাজ করছে কিনা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি হেলথ

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

‘ডাবল ডায়াবেটিস’ কেন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? প্রাথমিক লক্ষণ, কারণ ও জটিলতা এড়ানোর উপায়

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ডায়াবেটিস সাধারণত দুই ধরনের—টাইপ-১ ও টাইপ-২। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথভাবে সাড়া দিতে পারে না। তবে কিছু মানুষের টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতাও তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাকে সাধারণভাবে ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ বলা হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে হৃদ্যন্ত্র, চোখ, স্নায়ু ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের মতো কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে ‘ডাবল ডায়াবেটিস’ চিকিৎসাবিজ্ঞানে সর্বজনস্বীকৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ডযুক্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার বৈশিষ্ট্য দেখা দিলে সাধারণভাবে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

ভারতের ফোর্টিস হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের পরামর্শক চিকিৎসক ডা. ভানু মিশ্রের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্যন্ত্র, চোখ, স্নায়ু ও কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই লক্ষণগুলো শনাক্ত করার পাশাপাশি রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

ডাবল ডায়াবেটিস কী?

ডাবল ডায়াবেটিস বলতে সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়াকে বোঝায়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় খুব কম বা একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। কারণ, শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এ কারণে বেঁচে থাকার জন্য আক্রান্ত ব্যক্তির ইনসুলিন গ্রহণ অপরিহার্য।

অন্যদিকে, ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি আগের মতো সাড়া দেয় না। ফলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হয়। রক্তে শর্করা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখতে তখন শরীরের তুলনামূলক বেশি ইনসুলিন প্রয়োজন হতে পারে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কারও মধ্যে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ইনসুলিনের মাত্রা ও চিকিৎসাপদ্ধতি সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য জীবনযাপনের বিষয়েও পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

তবে শুধু ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা থাকলেই কারও টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই রোগের ধরন নির্ধারণ করা উচিত।

ডাবল ডায়াবেটিসের প্রাথমিক সতর্কসংকেত

ডাবল ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার লক্ষণের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই রক্তে শর্করার পরীক্ষায় পরিবর্তন ধরা পড়ে।

সম্ভাব্য সতর্কসংকেতগুলো হলো—

১. রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন বেশি থাকা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা অনুসরণ করার পরও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নির্ধারিত সীমার ওপরে থাকতে পারে।

২. অস্বাভাবিক ক্লান্তি: রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শরীরে ক্লান্তি ও শক্তির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

৩. অতিরিক্ত তৃষ্ণা: রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেলে প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেশি পানি বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে বারবার তৃষ্ণা অনুভূত হয়।

৪. ঘন ঘন প্রস্রাব: অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের করে দিতে কিডনিকে বেশি কাজ করতে হয়। এতে প্রস্রাবের পরিমাণ ও ঘনত্ব বাড়তে পারে।

৫. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা: গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এর পেছনে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা ছাড়াও একাধিক কারণ থাকতে পারে।

এসব লক্ষণ শুধু ডাবল ডায়াবেটিসের জন্য নির্দিষ্ট নয়। অনিয়ন্ত্রিত টাইপ-১ ডায়াবেটিস বা অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও এগুলো দেখা দিতে পারে। তাই রক্তে শর্করার মাত্রায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নিজে থেকে ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

এ ছাড়া বমি, পেটে ব্যথা, দ্রুত বা গভীর শ্বাস নেওয়া, বিভ্রান্তি কিংবা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের ইঙ্গিত হতে পারে। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।

কোন কোন কারণে ঝুঁকি বাড়ে?

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির পেছনে কয়েকটি কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অতিরিক্ত ওজন: বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে ইনসুলিনের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে অতিরিক্ত ওজন না থাকলেও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

শারীরিক পরিশ্রমের অভাব: নিয়মিত শরীরচর্চা পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহার করতে সাহায্য করে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়। দীর্ঘসময় বসে থাকা ও শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত শর্করা, চিনিযুক্ত পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস মোট ক্যালরি গ্রহণ ও ওজন বাড়াতে পারে। তবে একটি নির্দিষ্ট খাবারের চেয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শর্করাজাতীয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া উচিত নয়। খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ, ইনসুলিন গ্রহণ এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা ও বিপাকীয় সমস্যার প্রতি ব্যক্তির প্রবণতা বেশি হতে পারে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের গঠন, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য বিপাকীয় বিষয় এ ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে।

শুধু বেশি চিনি খাওয়ার কারণে ডাবল ডায়াবেটিস হয়—এ ধারণা সঠিক নয়। ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির পেছনে একাধিক জৈবিক ও জীবনযাপনসংক্রান্ত বিষয় কাজ করে।

শরীরের কোন কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে?

দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পড়তে পারে।

হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালি: ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি। রক্তে শর্করা বেশি থাকার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল, ধূমপান ও ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা থাকলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

চোখ: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে চোখের রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থাকে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বলা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। পরে রোগটি বাড়লে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্বও দেখা দিতে পারে। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করালে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব।

স্নায়ু: ডায়াবেটিসের কারণে স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলা হয়। এতে বিশেষ করে পা ও পায়ের পাতায় ঝিনঝিন করা, জ্বালাপোড়া, ব্যথা কিংবা অবশভাব দেখা দিতে পারে। অনুভূতি কমে গেলে পায়ের কাটা, ফোসকা বা ক্ষত সহজে বোঝা যায় না। ফলে সংক্রমণ ও পায়ের ঘা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নিয়মিত পা পরীক্ষা করা এবং ক্ষত, ফোলা, ত্বকের রং পরিবর্তন কিংবা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডাবল ডায়াবেটিস কিডনির ক্ষতি কীভাবে বাড়াতে পারে?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিডনির স্বাস্থ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ও রক্ত পরিশোধনের জন্য দায়ী গঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডা. ভানু মিশ্রের মতে, দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বা ডায়াবেটিসজনিত কিডনি রোগ দেখা দিতে পারে।

এই রোগ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে কিডনির ক্ষতি শুরু হলেও অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।

রোগ বাড়তে থাকলে কিডনির ছাঁকনি দিয়ে প্রস্রাবে প্রোটিন বেরিয়ে আসতে পারে। এটি কিডনির ক্ষতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। সময়ের সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। গুরুতর পর্যায়ে কিডনি বিকল হয়ে গেলে ডায়ালাইসিস কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে।

এ কারণে উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরিমাণ পরীক্ষা এবং রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির কার্যক্ষমতা নির্ণয় করে প্রাথমিক পর্যায়েই সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব।

জটিলতার ঝুঁকি কমাতে করণীয়

ডাবল ডায়াবেটিস সব সময় প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং হৃদ্রোগসহ অন্যান্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা পাওয়া যায়।

পরিকল্পিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাস: শাকসবজি, পূর্ণশস্য, উপযুক্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ও খাবারের সময় নির্ধারণ করতে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ইনসুলিন ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও তার সমন্বয় প্রয়োজন।

নিয়মিত শরীরচর্চা: হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার ও পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে, হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইনসুলিন গ্রহণের সময় ও মাত্রার সঙ্গে শরীরচর্চার সমন্বয় করতে হবে। ব্যায়ামের সময় বা পরেও রক্তে শর্করা কমে যেতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ জরুরি।

রক্তে শর্করা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: নিয়মিত গ্লুকোজ পরীক্ষা করলে রক্তে শর্করার ওঠানামার ধরন বোঝা যায়। ধারাবাহিক গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ব্যবহারকারীরা পরীক্ষার ফল ও প্রবণতা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া ইনসুলিনের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ: হৃদ্রোগ ও কিডনির জটিলতার ঝুঁকি কমাতে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাপনে পরিবর্তন বা ওষুধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

ধূমপান পরিহার: ধূমপান হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাতে পারে। হৃদ্যন্ত্র ও কিডনি সুরক্ষায় তামাক পরিহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

চোখ, পা ও কিডনি নিয়মিত পরীক্ষা: ডায়াবেটিসের জটিলতা অনেক সময় উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই তৈরি হয়। তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, পায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা এবং কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। কত ঘন ঘন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ডায়াবেটিসের ধরন, কত দিন ধরে রোগটি রয়েছে এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

সচেতনতাই জটিলতা এড়ানোর প্রথম ধাপ

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সঙ্গে ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলে তাকে সাধারণভাবে ডাবল ডায়াবেটিস বলা হয়। এ অবস্থায় রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে। তবে এটি সর্বজনস্বীকৃত নির্দিষ্ট মানদণ্ডযুক্ত আনুষ্ঠানিক রোগনির্ণয় নয়।

রক্তে শর্করা দীর্ঘদিন বেশি থাকা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে শুধু এসব লক্ষণ দেখে ডাবল ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায় না।

সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি চোখ, স্নায়ু ও কিডনির ক্ষতি শনাক্ত করতে নিয়মিত পরীক্ষা করাও জরুরি।

টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। ইনসুলিন প্রতিরোধক্ষমতা বা অন্য কোনো সমস্যা এর পেছনে কাজ করছে কিনা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়া যেতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি হেলথ