বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়েও কেন হুতিদের ঠেকাতে পারছে না সৌদি?
- আপডেট সময় : ০৪:৪১:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১০ বার পঠিত

আধুনিক সমরাস্ত্রের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে সৌদি আরব। তারপরও রিয়াদ বিমানবন্দরসহ কয়েকটি স্থানে হুতিদের প্রাণঘাতী হামলা ঠেকাতে পারেনি। যা ইঙ্গিত দেয়, ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির আক্রমণ প্রতিহতের ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি আছে।
এক দশকের মধ্যে সৌদির মাটিতে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা হয় গত শনিবার। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এতে দুই বাংলাদেশিসহ আট দেশের ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা তিন’শর বেশি। এ ঘটনার পর বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলতে নিজ নাগরিকদের সতর্ক করেছে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন।
একই বিমানবন্দরে রোববার নতুন হামলা চালায় হুতিরা। এতে এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিসহ ২৪ ঘণ্টায় সৌদির একাধিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে হুতিরা। আরও অভিযান চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সৌদি আরব তেলসমৃদ্ধ দেশ। স্থিতিশীলতার জন্যও পরিচিত। কিন্তু একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে এসব সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সৌদি আরব কি হামলা ঠেকাতে অক্ষম?
হুতিদের নিয়মিত হামলা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। তাদের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। শুধু সৌদি আরব নয়, বিশ্বজুড়েই ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংঘাতের শুরুর দিকে প্রায়ই হুতিদের হামলা প্রতিহত করেছে রিয়াদ। কিন্তু গত দুইদিনের হামলা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কিং খালিদ বিমানবন্দরটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে। আয়তন প্রায় ২২৫ বর্গকিলোমিটার।
সৌদি আরবের আয়তন প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার। লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণের প্রতিষ্ঠান মিনা অ্যানালিটিকার বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, দেশটির কাছে প্যাট্রিয়ট, থাড, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সেন্সরের সমন্বয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আছে। কিন্তু বিশাল আয়তনের তুলনায় এসব ব্যবস্থা কোনো অভেদ্য দেয়াল তৈরি করতে পারেনি।
আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আরও বলেন, দেশটিকে একসঙ্গে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে আছে বিভিন্ন তেল স্থাপনা, পবিত্র নগরী, সামরিক ঘাঁটি ও বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর।
এতসব স্থাপনার বিপরীতে সৌদির নিজস্ব সামরিক শিল্প সক্ষমতা সীমিত। সেগুলো আমদানি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। নিজস্বতার ঘাটতি পূরণে তারা ঐতিহাসিকভাবে বিদেশি কর্মী, ঠিকাদার ও প্রশিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল।
দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশের অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোর কাছে থেকে বড় অঙ্কের অস্ত্র কেনে। এটি তাদের প্রতিরক্ষা নীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখারও কূটনৈতিক কৌশল।
হুতিরা কেন হামলা বাড়াচ্ছে?
বিপুল অর্থ খরচ করে সৌদির নির্মিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়াটা হুতিদের লক্ষ্য নয়। এমনকি তারা সম্ভবত প্রতিবার সফল হামলারও আশা করে না। দু-একটি লক্ষ্যবস্তুতে ঠিকঠাক মতো আঘাত হানতে পারাটা তাদের জন্য বড় অর্জন বলে মনে করেন আন্দ্রেয়াস ক্রিগ।
এই ঝুঁকি বিশ্লেষকের মতে, রিয়াদ বিমানবন্দরটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে হুতিরা একাধিকবার হামলা করেছে। এটি প্রমাণ করে, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে টানা হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার প্রেক্ষাপটে সৌদিতে হুতিদের হামলার মাত্রা বেড়েছে। কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক থমাস জুনো বলেন, হুতিরা খেলার নিয়ম নতুন করে লিখতে চাইছে। তাদের নিয়ন্ত্রিত সানা বিমানবন্দরে সৌদি জোট যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা করছে। রিয়াদ যা করছে, হুতিরা ঠিক একই উপায়ে জবাব দিচ্ছে।
গোষ্ঠীটির হাজার হাজার প্রশিক্ষিত ও লড়াকু যোদ্ধা আছে। সবাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনগুলো উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের মাথা ব্যথার কারণ হয়েছে। সম্প্রতি এসব অস্ত্র দিয়ে ইসরায়েল পর্যন্ত হামলা করেছে।
সৌদি আরব বহু বছর ধরে ইয়েমেনের একাংশের সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। থমাস জুনো বলেন, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে হুতিরা একটি বার্তা দিতে চাইছে। সেটি হলো- ভিন্ন দেশে শান্তি স্থাপন করতে চাইলে চড়া মূল্য দিতে হবে।
সৌদি আরব কী করছে?
আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, রিয়াদ বিমানবন্দরটি সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’-এর একটি অংশ। রূপকল্পটির আওতায় রিয়াদকে পর্যটক, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
হুতিরা বিষয়টি খুব ভালো করেই জানে বলে মনে করেন ক্রিগ। তিনি বলেন, রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার ফলে সৌদি আরবের সামরিক শক্তি হয়তো কমবে না। কিন্তু সেখানে ধারাবাহিক হামলা হলে অর্থনীতি ও ভাবমূর্তির ক্ষতিতে পড়বে। এটির মূল্য অবকাঠামোগত ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি।
কয়েকদিন পরই রিয়াদে বিভিন্ন উচ্চ-পর্যায়ের সম্মেলন ও বিনোদন মৌসুম শুরু হবে। এর আগে হুতিরা হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর পর সৌদির কর্তৃপক্ষ মোবাইলে খুদে বার্তার মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করতো। কিন্তু সম্প্রতি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক নাগরিক আতঙ্ক, উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন।
সৌদি কর্মকর্তাদের কাছে থেকে নিয়মিত তথ্য না পাওয়ায় শনিবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বিভিন্ন বিদেশি মিশন। এমনকি, সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই কয়েকটি দূতাবাস নিজ নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছিল।










